এইমাত্র পাওয়া

বিএনপি নেতাদের প্রথম গণভবন দর্শন

নভেম্বর ১, ২০১৮

অজয় দাশগুপ্ত
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলামসহ বিএনপি আরও চার গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। তবে তারা এ জন্য নেতা হিসেবে সামনে রেখেছেন ড. কামাল হোসেনকে, গণভবন যার কাছে খুব চেনা। চার দশক আগে ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গঠিত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির নেতাদের এটাই হবে প্রথম আনুষ্ঠানিক গণভবন দর্শন। সেখানে তাদের অবস্থান স্বস্তির হোক, আনন্দপূর্ণ হোক- এটাই কাম্য। তবে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য শেরে বাংলা নগরের গণভবনে গিয়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একজন গৃহবধূ হিসেবে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। তবে দু’জনের এ সাক্ষাৎ সম্ভবত ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার গণভবন দর্শন ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবরেই হতে পারত। ২৫ অক্টোবর ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের এক জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া ‘আজ-কালের’ মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরদিন খালেদা জিয়াকে ফোন করে ৩৭ মিনিট কথা বলেন এবং গণভবনে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু খালেদা জিয়া ‘হরতালের মধ্যে’ (তখন ৬০ ঘণ্টার হরতাল চলছিল) আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। এভাবে তার গণভবন দর্শনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। গত পাঁচ বছরে বিএনপির নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আলোচনায় বসার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি। গণভবন দর্শনও হয়নি।

এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি তা কেবল বয়কট করেনি, প্রতিহতের চেষ্টা করে। বেগম খালেদা জিয়া সংসদ সদস্য না থাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংসদ ভবনে দেখা হয়নি তার। পরের বছরের প্রথম তিন মাস বিএনপি শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্য টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি বলবৎ করার চেষ্টা করে। এ কর্মসূচি চলাকালে ২৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হয়। সে সময়ে সমবেদনা জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির গুলশানস্থ কার্যালয়ে গিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে। কিন্তু বিএনপির নেতা-কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। এভাবে দুই নেত্রীর সাক্ষাতের আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতা ছিল প্রাদেশিক গভর্নরের হাতে। তার অফিস ও বাসবভন ছিল গভর্নর হাউসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর গভর্নর হাউস বঙ্গবভন নাম পায়। এটা পরিণত হয় রাষ্ট্রপতির অফিস ও বাসসভনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রমনা পার্কের কাছে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট দ্বিতল ভবনকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। এর নাম দেওয়া হয় ‘গণভবন’। ১৯৭৪ সালে শেরে বাংলা নগরে বর্তমান গণভবন নির্মাণ কাজ শেষ হলে বঙ্গবন্ধু সেখানে অফিস শুরু করেন। তবে বঙ্গবন্ধু বরাবরই ধানমণ্ডি বাসভবনে থেকেছেন। আমার দুটি গণভবনেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সামরিক শাসন জারি হলে গণভবনকে পরিণত করা হয় সামরিক আদালতে। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে অফিস করতেন বঙ্গভবনে। আর বসবাস করতেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসক এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বসবাস করতেন। তবে তার আমলে তেজগাঁওয়ে সাবেক সংসদ ভবনকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পরিণত করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েও এখানেই অফিস করতে থাকেন। এভাবে আমরা পেয়ে যাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, যা এখনও চালু আছে। তবে খালেদা জিয়া বসবাস করতে থাকেন ক্যান্টনমেন্টে।

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথম বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। শেরে বাংলা নগরের গণভবন তার কাছে কেবল একটি অফিস নয়, ছিল গভীর আবেগের। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানেই সর্বশেষ অফিস করেছেন। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর আমলে গণভবন তার বাসস্থানে পরিণত হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় রয়ে যায় তেজগাঁতেই। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ফের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে গণভবনকে কখনও ব্যবহার করেননি। কেন গণভবনে আপত্তি, তার কারণ বোধগম্য নয়। ফের এ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা হয়। বিএনপি নেতারাও গণভবন দর্শনের সুযোগ পাননি। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা আবার গণভবনে বসবাসের জন্য ফিরে যান। তার দায়িত্ব পালনকালে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা গণভবনে গিয়েছিলেন, এমনটি জানা যায় না। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজরিত এ স্থানটি তাদের কখনও আকৃষ্ট করেনি। ১ নভেম্বর (২০১৮) হবে তাদের প্রথম গণভবন দর্শন। কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কের অফিসটিকে জিয়াউর রহমান ‘সামরিক আদালতে’ পরিণত করেছিলেন, সে প্রশ্ন তাদের মনে একবারের জন্যও উদয় হবে কি? চার দশক ধরে বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার করার নীতিও কি সঠিক ছিল?

লেখক: সাংবাদিক

৩১ অক্টোবর, ২০১৮

ajoydg@gmail.com

আর্কাইভ

ডিসেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি
« নভে    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  

শিরোনাম :